ইসলামীক কিছু হাদিস
📘 "আল্লাহ নেককারদের ভালবাসেন" 📘
"""""""''''''''""""''""""""""""""'""""""""""""""""""""""""""""""
[সূরা-আলে ইমরান-১৩৪, তফসীর]
------------------------------------------------
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম,
-----------------------------------------
আল্লাহ তা'আলা বলেন-
---
"যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায়
(আল্লাহর পথে) ব্যয় করে এবং,
যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, (আর) আল্লাহ
সৎকর্মশীলদের (নেককারদের) ভালবাসেন।"
_____[সুরা, আলে ইমরান, আয়াত-১৩৪]____
~~~
আয়াতের তাফসীর:
অতঃপর আল্লাহ পাক জান্নাতবাসীদের বিশেষণ বর্ণনা করেছেন যে,
তারা সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে এবং স্বচ্ছলতায় ও অভাবে, মোটকথা সর্বাবস্থাতেই আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে।
যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ যারা দিনে-রাতে প্রকাশ্যে ও গোপনে তাদের সম্পদ খরচ করে থাকে।' (২:১৭৪)
কোন কিছু তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্য হতে বিরত রাখতে পারে না।
তারা তাঁর নির্দেশক্রমে তার সৃষ্টজীবের উপর অনুগ্রহ করে থাকে।
(আরবী) শব্দের অর্থ গোপন করাও হয়ে থাকে। অর্থাৎ এমন কি তারা তাদের ক্রোধ প্রকাশ পর্যন্তও করে না।
কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
“হে আদম সন্তান! তুমি যদি ক্রোধের সময় আমাকে স্মরণ কর অর্থাৎ আমার নির্দেশ মান্য করতঃ
ক্রোধ সংবরণ করে নাও তবে আমিও আমার ক্রোধের সময় তোমাকে স্মরণ করবো অর্থাৎ তোমার ধ্বংসের সময় তোমাকে ধ্বংস হতে রক্ষা করবো'। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম)
~~~
অন্য হাদীসে রয়েছে,
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করে, আল্লাহ তার উপর হতে শাস্তি সরিয়ে নেন।
আর যে ব্যক্তি স্বীয় জিহ্বাকে (শরীয়ত বিরোধী কথা হতে) সংযত রাখে, আল্লাহ তা'আলা তার গোপনতা রক্ষা করেন,
এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট ওযর পেশ করে, আল্লাহ তাআলা তার ওযর গ্রহণ করে থাকেন।
(মুসনাদ-ই-আবি ইয়ালা) এ হাদীসটি গারীব এবং এর সনদের ব্যাপারেও সমালোচনা রয়েছে।
~~~
অন্য হাদীসে রয়েছে,
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ
“ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ নয় যে কাউকে মল্লযুদ্ধে পরাস্ত করে,
বরং প্রকৃতপক্ষ ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ যে ক্রোধের সময় ক্রোধ দমন করতে পারে।'
(মুসনাদ-ই-আহমাদ)
~~~
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে,
রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি যার নিকট তার উত্তরাধিকারীর মাল নিজের মাল অপেক্ষা বেশী প্রিয় হয় ?
জনগণ বলেনঃ
“হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই।
তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ
“আমি তো দেখেছি যে, তোমরাই তোমাদের নিজস্ব মাল অপেক্ষা তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী পছন্দ করছো !
কেননা, প্রকৃতপক্ষে তোমাদের নিজস্ব মালতো ওটাই যা তোমরা,
তোমাদের জীবদ্দশায় আল্লাহ তা'আলার পথে ব্যয় করে থাক এবং যা তোমরা ছেড়ে যাও তা তো তোমাদের মাল নয়,
বরং তোমাদের উত্তরাধিকারীদের মাল।
তাহলে তোমাদের আল্লাহ পাকের পথে খরচ কম করা এবং,
জমা বেশী রাখা ওরই প্রমাণ যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের মাল অপেক্ষা উত্তরাধিকারীদের মালকেই বেশী ভালবাস। অতঃপর তিনি বলেনঃ
“তোমারা কোন্ লোককে বীর পুরুষ মনে কর?' জনগণ বলেনঃ
হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! ঐ ব্যক্তিকে (আমরা বীর পুরুষ মনে করি) যাকে কেউ মল্লযুদ্ধে নীচে ফেলতে পারে না।
তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ
না, বরং প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী বীর পুরুষ ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজকে সামলিয়ে নিতে পারে।
তারপরে তিনি বলেনঃ
‘তোমরা নিঃসন্তান কাকে বল?'
জনগণ বলেনঃ যাদের কোন সন্তান-সন্ততি নেই।' তিঁনি বলেনঃ
না, বরং নিঃসন্তান ঐ ব্যক্তি যার সামনে তার কোন সন্তান মারা যায়নি। (সহীহ মুসলিম)
~~~
একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ
দরিদ্র কে তোমরা জান কি ?
সাহাবীগণ বলেনঃ
যার কোন ধন-সম্পদ নেই।
তিঁনি বলেনঃ
না, বরং ঐ ব্যক্তি দরিদ্র যে নিজের জীবদ্দশায় স্বীয় মাল আল্লাহর পথে ব্যয় করে না'।
(মুসনাদ-ই-আহমাদ)
~~~
হযরত হারেসা ইবনে কুদ্দামা সা'দী (রাঃ) নবী করীম (সঃ)-এর খিমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ
“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ! আমাকে কোন উপকারী কথা বলুন।
তা যেন সংক্ষিপ্ত হয়,
তাহলে আমি মনেও রাখতে পারবো।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ
“রাগ করো না।'
তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ উত্তরই দেন।
কয়েকবার একই প্রশ্ন ও উত্তর হয়।
(মুসনাদ-ই-আহমাদ)
কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ
“হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) !
আমাকে কিছু উপদেশ দিন।'
তিঁনি বলেনঃ রাগ করো না।'
তিনি বলেনঃ আমি চিন্তা করে বুঝলাম যে, ক্রোধই হচ্ছে সমস্ত খারাপ ও অন্যায়ের মূল'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)
~~~
একটি বর্ণনায় রয়েছে যে,
হযরত আবু যর (রাঃ) একবার ক্রোধান্বিত হয়ে বসে পড়েন এবং তার পরে শুয়ে যান।
তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনেছি,
তিঁনি বলেছেন,
যার ক্রোধ হয় সে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন বসে পড়ে তাতেও যদি ক্রোধ প্রশমিত না হয় তবে যেন শুয়ে পড়ে। (মুসনাদ-ইআহমাদ)
~~~
মুসনাদ-ই-আহমাদের আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত উরওয়া ইবনে মুহাম্মাদ (রঃ) একবার ক্রোধান্বিত হন।
তিনি অযু করতে বসে পড়েন এবং বলেনঃ
আমি আমার শিক্ষকগণ হতে এ হাদীসটি শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ
“ক্রোধ শয়তানের পক্ষ হতে হয়ে থাকে এবং শয়তান অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে, আর আগুনকে নির্বাপণকারী হচ্ছে পানি।
সুতরাং তোমাদের ক্রোধ হলে অযু করতে বসে পড়।'
রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এটাও ইরশাদ আছে যে,
“যে ব্যক্তি কোন দরিদ্রকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণ ক্ষমা করে দেয়,
আল্লাহ তাকে জাহান্নাম হতে মুক্ত করে থাকেন। হে জনমণ্ডলী !
জেনে রেখো যে, জান্নাতের কাজ খুব কঠিন এবং জাহান্নামের কাজ সহজ।
সৎ ঐ ব্যক্তি যে গণ্ডগোল হতে বেঁচে যায়। কোন চুমুককে পান করে নেয়া,
অল্লাহ তাআলার ততো পছন্দনীয় নয় যতো পছন্দনীয় ক্রোধের চুমুককে পান করে নেয়া। এরূপ ব্যক্তির অন্তরে ঈমান দৃঢ়ভাবে বসে যায়।' (মুসনাদ-ই-আহমাদ)
~~~
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ
“যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে রাখে আল্লাহ তা'আলা তার অন্তরকে শান্তি ও নিরাপত্তা দ্বারা পূর্ণ করে দেন।
যে ব্যক্তি আঁকজমক পূর্ণ পোষাক পরিধানে সমর্থ হওয়া সত্ত্বেও,
বিনয় প্রকাশার্থে তা পরিত্যাগ করে,
কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাকে সম্মানের হুল্লা (লুঙ্গী ও চাদর) পরিধান করাবেন।
আর যে ব্যক্তি কারও রহস্য গোপন রাখবে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাকে বাদশাহী মুকুট পরাবেন।' (সুনানে আবু দাউদ)
~~~
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ
“যে ব্যক্তি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে,
তাকে আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলুকের সামনে ডেকে অধিকার প্রদান করবেন যে,
সে কোন হুরকে ইচ্ছে মত পছন্দ করতে পারে।
~~~
(মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ বিষয়ের আরও বহু হাদীস রয়েছে।
সুতরাং আয়াতের ভাবার্থ হলো এই যে,
তাদের ক্রোধ বাইরে প্রকাশ পায় না এবং তাদের পক্ষ হতে লোকের প্রতি কোন অন্যায় হয় না। বরং তারা উত্তেজনাকে দমিয়ে রাখে।
আর তারা আল্লাহকে ভয় করতঃ পুণ্যের আশায় সমস্ত কাজ আল্লাহ তা'আলার উপর সমর্পণ করে।
তারা মানুষের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। আত্যাচারীদের অত্যাচারের প্রতিশোধ তারা গ্রহণ করে না।
একেই বলে অনুগ্রহ এবং এরূপ অনুগ্রহশীল বান্দাকেই আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন।
~~~
হাদীসে রয়েছে যে,
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ
‘তিনটি কথার উপর আমি শপথ গ্রহণ করছিঃ
(১) সাদকা দ্বারা মাল হ্রাস পায় না,
(২) মানুষের অপরাধ ক্ষমা করার মাধ্যমে মানুষের সম্মান বেড়ে যায় এবং
(৩) আল্লাহ তা'আলা বিনয় প্রকাশকারীর মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।
~~~
মুসতাদরিক-ই-হাকীমে হাদীস রয়েছে,
যে ব্যক্তি চায় যে,
তার ভিত্তি উঁচু হোক এবং মর্যাদা বেড়ে যাক তার জন্যে উচিত হবে যে,
সে যেন অত্যাচারীদেরকে ক্ষমা করে দেয়, যারা দেয় না তাদেরকে প্রদান করে,
এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন যুক্ত করে।
~~~
অন্য হাদীসে রয়েছে যে,
কিয়ামতের দিন এক আহবানকারী ডাক দিয়ে বলবেনঃ
“হে জনগণকে ক্ষমাকারীগণ !
তোমাদের প্রভুর নিকট এসো এবং স্বীয় প্রতিদান গ্রহণ কর।
ক্ষমাকারী প্রত্যেক মুসলমানের জান্নাতে যাওয়ার অধিকার রয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে,
তারা পাপ কার্য করার পর তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করে এবং তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে।
__________[তফসীর ইবনে কাসির]_______
কোন মন্তব্য নেই